Friday, May 1, 2026
Homeসারাদেশঠাকুরগাঁওয়ে চড়ক পূজা ঘিরে শতবর্ষী মেলা, কারুশিল্প প্রদর্শনী

ঠাকুরগাঁওয়ে চড়ক পূজা ঘিরে শতবর্ষী মেলা, কারুশিল্প প্রদর্শনী

ঠাকুরগাঁও শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে ফাড়াবাড়ি এলাকা। এখানকার একটি শতবর্ষী গাছের নিচে শিবকালি মন্দিরকে ঘিরে উদযাপিত হয়েছে ১০৫ বছরের ঐতিহ্যবাহী চড়ক পূজা ও মেলা। 

প্রতি পাঁচ বছর অন্তর আয়োজিত এই উৎসবকে ঘিরে এবারও মানুষের ঢল নেমেছিল। তবে চিরাচরিত মেলার বাইরেও এবারের অন্যতম আকর্ষণ ছিল স্থানীয়দের তৈরি কারুশিল্প প্রদর্শনী।

তিন দিনব্যাপী এই উৎসবের সমাপনী দিনে গতকাল সোমবার দুপুর থেকে মন্দির প্রাঙ্গণে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়তে থাকে। ঢাক-ঢোল ও কাঁসরের শব্দে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

বিকেলে শুরু হয় কারুশিল্প প্রদর্শনী। এতে অংশ নেন আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের শৌখিন শিল্পীরা। 

বাঁশ ও কাগজ দিয়ে তৈরি হাতি, ঘোড়া, বাঘ, জিরাফ, কুমির, সাপ, ব্যাঙসহ বিলুপ্তপ্রায় বিভিন্ন প্রাণীর বিশালাকৃতির প্রতিকৃতি দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। 

পাশাপাশি ছিল জিপগাড়ি ও হেলিকপ্টারের মডেলও। শিল্পীরা তাদের তৈরি এসব নিদর্শন কাঁধে নিয়ে মাঠ প্রদক্ষিণ করেন। শুধু বিনোদন নয়, প্রতিটি শিল্পকর্মের পেছনে ছিল সচেতনতামূলক বার্তা।

স্থানীয় কৃষক জগদীশ রায়ের নেতৃত্বে একটি দল প্রায় বিশ দিন পরিশ্রম করে বড় আকৃতির একটি হাতির প্রতিকৃতি তৈরি করে। দলটিকে এটি কাঁধে নিয়ে মেলা প্রাঙ্গণের চারদিক প্রদক্ষিণ করতে দেখা যায়। 

অন্যদিকে দক্ষিণ বঠিনা গ্রামের খগেশ্বর রায়ের দল বাঘ ও হরিণের প্রতিকৃতি তৈরি করে। তাদের তৈরি বাঘটি একটি মানুষকে কামড়ে ধরে আছে—এমন দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়।

খগেশ্বর রায় বলেন, বন্যপ্রাণী শিকার বন্ধ ও সংরক্ষণের বার্তা তুলে ধরতেই এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। 

পাশের ফাড়াবাড়ি গ্রামের যুবক পরেশ চন্দ্র বর্মন তৈরি করেছেন সাপ, ব্যাঙ ও বেজি। তিনি বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৈচিত্র্যময় প্রাণিকূলের ভূমিকা অপরিসীম। অনেক প্রাণী অযাচিত শিকার ও খাদ্যাভাবের কারণে দিন দিন হারিয়ে যাওয়ায় আমাদের পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। তাই মানুষকে সচেতন করা ও এসব প্রাণী সংরক্ষণের গুরুত্ব বোঝাতেই আমি এগুলো তৈরি করে প্রদর্শন করেছি।   

প্রদর্শনীতে এক কিশোরকে শকুনের বেশ ধারণ করে মাঠে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। বিলুপ্তপ্রায় এই পাখি সংরক্ষণের আহ্বান জানানো হয় এর মধ্য দিয়ে। 

স্থানীয় দুই তরুণ জীবন রায় ও উদয় রায় বলেন, খাল-বিল-নালা সংকোচনের সঙ্গে সঙ্গে দেশি প্রজাতির মাছ ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। এসব মাছ সংরক্ষণ ও বিস্তারে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে এখানে রুই ও কাতলার প্রতিকৃতি উপস্থাপন করেছেন তারা। 

অন্যদিকে বিশ্বজিৎ রায়ের নেতৃত্বে নির্মিত একটি হেলিকপ্টারের রেপ্লিকা প্রদর্শনীতে স্থান পায়। তিনি বলেন, তরুণ প্রজন্মের মাঝে প্রযুক্তির ব্যবহার ও এর অগ্রগতি সম্পর্কে জানানো ও আগ্রহ বাড়াতে তাদের এই প্রয়াস। 

প্রদর্শনী শেষে পাশের খোলা মাঠে বসা মেলায় ভিড় করেন দর্শনার্থীরা। মেলায় শতাধিক দোকানে খেলনা, অলঙ্কার, মৃৎশিল্পীদের নির্মিত বিভিন্ন সামগ্রীসহ নানা পণ্য বিক্রি হয়। পাশাপাশি গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী নানা খাবারের দোকান ছিল।

প্রদর্শনী ঘিরে দর্শনার্থীদের মাঝেও ব্যাপক উৎসাহ দেখা যায়। স্থানীয় কলেজ শিক্ষক বিপ্লব কুমার মোহন্ত বলেন, এ ধরনের আয়োজন মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে সহায়ক হবে।

ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের চারু ও কারুকলা শিক্ষক কাদিমুল ইসলাম বলেন, প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়া শিল্পীদের কেউই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রশিক্ষিত নন। পেশাদারিত্বের ঘাটতি থাকলেও তাদের সৃজনশীলতা দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করেছে, আমারও ভালো লেগেছে। 

প্রবীণ শিক্ষাবিদ মনতোষ কুমার দে বলেন, যেসব প্রাণী আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে, তা প্রদর্শন করে তারা আমাদের সচেতন করার চেষ্টা করছেন।

শিবকালি মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি বাবুল বর্মন বলেন, এই মেলা বহু বছর ধরে চলে আসছে। সব ধর্মের মানুষ এতে অংশ নেন। এ ধরনের আয়োজন সামাজিক সম্প্রীতির দৃঢ় বন্ধন তৈরি করে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments