Friday, May 1, 2026
Homeআন্তর্জাতিকমালিতে কী হচ্ছে, বামাকো পতনের দ্বারপ্রান্তে?

মালিতে কী হচ্ছে, বামাকো পতনের দ্বারপ্রান্তে?

পশ্চিম আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলের দেশ মালি ২০২৬ সালের শুরু থেকেই এক গভীর নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সংকটে আছে। সাম্প্রতিক সময়ে আল-কায়েদা-সম্পৃক্ত জিহাদি জোট জামাআত নুসরাত আল-ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন দেশটির উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে যে সমন্বিত হামলা চালিয়েছে, তা শুধু সামরিক ব্যর্থতাই নয়—রাষ্ট্রীয় কাঠামোর স্থায়িত্ব নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে।

ইতোমধ্যে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর হামলায় মালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল সাদিও কামারা নিহত হয়েছেন। রাজধানী বামাকোর প্রায় ১৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে কঠোরভাবে সুরক্ষিত সামরিক শহর কাতিতে কামারার বাসভবন। হামলাকারীরা সেখানে আত্মঘাতী গাড়িবোমা হামলা চালায়। ওই এলাকায় অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট আসিমি গোইতাও বসবাস করেন।

২০২০ ও ২০২১ সালে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করা সামরিক সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন কামারা। অনেকে তাকে মালির সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবেও দেখতেন। ফলে হামলাটি দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের নিরাপত্তা ব্যবস্থার গভীর দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এসব হামলার পর রাজধানী বামাকোর নিরাপত্তা পরিস্থিতি এতটাই নাজুক হয়ে পড়ে যে ‘রাজধানী ঘিরে অস্থিতিশীলতার বলয়’ তৈরি হয়েছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।

এই হামলাগুলো একক কোনো ঘটনা নয়। বরং এটি এমন এক দীর্ঘ যুদ্ধের অংশ, যা ২০১২ সালের তুয়ারেগ বিদ্রোহ থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে জিহাদি বিদ্রোহ, বিদেশি হস্তক্ষেপ, সামরিক অভ্যুত্থান এবং রাষ্ট্রীয় ভাঙনের ঝুঁকির দিকে গড়িয়েছে।

২০১৩ সালে ফ্রান্সের সামরিক অভিযান পরিস্থিতিকে সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণে আনলেও দীর্ঘমেয়াদে তা স্থায়ী শান্তি আনতে ব্যর্থ হয়। এরপর জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন এবং পশ্চিমা সামরিক উপস্থিতিও একই পরিণতির মুখে পড়ে, অর্থাৎ সাময়িক নিরাপত্তা ফিরলেও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরেনি।

রাশিয়ার আবির্ভাব

এই ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে মালিতে ২০২০ ও ২০২১ সালে পরপর সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে এবং জান্তা সরকার ক্ষমতা দখল করে। তারা পশ্চিমা শক্তিকে দেশ থেকে সরিয়ে দেয় এবং ফ্রান্সসহ ইউরোপীয় মিত্রদের প্রভাব কার্যত শেষ করে দেয়। এপি ও রয়টার্স বলছে, এই শূন্যতার মধ্যেই রাশিয়া দ্রুত জায়গা করে নেয় এবং ‘নিরাপত্তা অংশীদার’ হিসেবে সামনে আসে। এখান থেকেই মালির বর্তমান ভূরাজনৈতিক রূপান্তরের সূচনা।

রাশিয়ার উপস্থিতি শুরু হয় মূলত ওয়াগনার গ্রুপের মাধ্যমে, যা পরে ‘আফ্রিকা কর্পস’ নামে পুনর্গঠিত হয়। তারা মালির সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণ, অস্ত্র এবং যৌথ সামরিক অভিযানে সহায়তা দেয়। তবে বাস্তব পরিস্থিতি হলো, এই সহযোগিতার পরও জিহাদি হামলা কমেনি; বরং অনেক এলাকায় বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো আরও সংগঠিত ও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে।

সাম্প্রতিক হামলাগুলো দেখিয়েছে যে, রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী ও রুশ-সমর্থিত বাহিনী উভয়ই একসঙ্গে জিহাদিদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হচ্ছে।

বামাকো কি পতনের দ্বারপ্রান্তে?

এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—বামাকো কি সত্যিই পতনের দ্বারপ্রান্তে?

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের একাংশ বলছে, ‘রাষ্ট্র ভেঙে পড়ার’ পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি, তবে রাজধানীর চারপাশে নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়া, গ্রামীণ অঞ্চলগুলোতে জিহাদিদের প্রভাব বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক কাঠামোর ভাঙন একটি বিপজ্জনক প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে উত্তর ও মধ্য মালির বড় অংশে রাষ্ট্রীয় উপস্থিতি কার্যত সীমিত হয়ে পড়েছে, যা ভবিষ্যতে রাজধানীর ওপর চাপ বাড়াতে পারে বলে জানিয়েছে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।

এই সংকটের ভেতর রাশিয়ার ভূমিকা শুধু সামরিক নয়, বরং গভীর কৌশলগত। বিশ্লেষকদের মতে, মালিতে রাশিয়ার প্রধান স্বার্থ তিনটি স্তরে বিভক্ত। প্রথমত, আফ্রিকায় পশ্চিমা—বিশেষ করে ফ্রান্সের ঐতিহাসিক প্রভাব হ্রাস করে একটি নতুন ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করা। দ্বিতীয়ত, মালির স্বর্ণ ও অন্যান্য খনিজ সম্পদের সঙ্গে যুক্ত অর্থনৈতিক সুযোগ কাজে লাগানো। তৃতীয়ত, ‘নিরাপত্তার বিনিময়ে রাজনৈতিক প্রভাব’ মডেলের মাধ্যমে আফ্রিকায় দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অবস্থান গড়ে তোলা।

ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মঞ্চ

এই কৌশলের ফলে মালি এখন একটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মঞ্চে পরিণত হয়েছে। একদিকে রাশিয়া নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে অবস্থান শক্ত করছে, অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্ব সরাসরি সামরিক উপস্থিতি কমিয়ে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করছে।

একই সময়ে চীনও অবকাঠামো ও ঋণনির্ভর বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করছে, ফলে দেশটি কার্যত একাধিক শক্তির প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে গেছে।

এদিকে জিহাদি গোষ্ঠীগুলোও তাদের কৌশল পরিবর্তন করেছে। তারা এখন শুধু হামলা চালাচ্ছে না, বরং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ‘ছায়া প্রশাসন’ তৈরি করছে। ড্রোন ব্যবহার, সমন্বিত আক্রমণ এবং সীমান্ত অতিক্রম করে অভিযান পরিচালনা তাদের সক্ষমতা আগের তুলনায় অনেক বাড়িয়েছে। এই পরিবর্তন সাহেল অঞ্চলকে একটি সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের অঞ্চলে পরিণত করছে।

ইউএন এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রাম বলছে, মালির সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জলবায়ু ও অর্থনীতি। সাহেল অঞ্চলে খরা, মরুকরণ এবং কৃষিজমির সংকট স্থানীয় জনগণের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। এই অর্থনৈতিক দুর্বলতা জিহাদি গোষ্ঠীগুলোর জন্য নতুন সদস্য সংগ্রহের কাজটিকে সহজ করছে। একইসঙ্গে স্বর্ণ খাতের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অর্থায়নের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে, যা সংঘাতকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করছে।

ভবিষ্যতে কোন পথে মালি?

আঞ্চলিক দিক থেকেও পরিস্থিতি জটিল। মালি, নাইজার ও বুরকিনা ফাসো—এই তিনটি দেশ সামরিক শাসনের অধীনে একটি নতুন নিরাপত্তা জোট গঠনের চেষ্টা করছে, যা পশ্চিমা প্রভাব থেকে সরে আঞ্চলিক আত্মনির্ভরশীলতার দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে। একইসঙ্গে এই জোট সাহেল অঞ্চলে একটি নতুন রাজনৈতিক ব্লকের সূচনা করছে, যা ভবিষ্যতে আরও অস্থিরতা তৈরি করতে পারে বলে জানিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ।

সব মিলিয়ে মালির বর্তমান পরিস্থিতি একটি একক সংকট নয়; বরং বহুস্তরীয় সংকটের সমষ্টি। এখানে রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা, জিহাদি বিদ্রোহ, জলবায়ু সংকট, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতা একসঙ্গে কাজ করছে।

বামাকো এখনো পুরোপুরি পতনের মুখে না দাঁড়ালেও, এর চারপাশে তৈরি হওয়া চাপ স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ক্রমেই ক্ষয়িষ্ণু হয়ে উঠছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকটের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তিনটি বিষয়ের ওপর—রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠন, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক শক্তিগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা। এর কোনোটিই যদি কার্যকর না হয়, তবে মালি কেবল একটি দেশের সংকট হিসেবে থাকবে না; বরং সাহেল অঞ্চলে একটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments