Wednesday, April 29, 2026
Homeখেলাম্যাচ জেতানো গোলের চেয়েও বেশি কিছু

ম্যাচ জেতানো গোলের চেয়েও বেশি কিছু

বন্ধুত্ব কখনো শুধু পাশে থাকার নাম নয়। কখনো তা হয়ে ওঠে অনুপস্থিতির মধ্যেও উপস্থিত থাকা। নিঃশব্দে, অদৃশ্যভাবে, কিন্তু গভীরভাবে। এমন এক অনুভূতি, যা ছোঁয়া যায় না, দেখা যায় না, তবুও সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে এসে দাঁড়ায় বুকের ঠিক মাঝখানে, এক অদ্ভুত শক্তি হয়ে।

সেই শক্তিকেই যেন সঙ্গে নিয়ে খেলছিলেন আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা।

তারিখটা ছিল ১১ জুলাই, ২০১০। ম্যাচ তখন ধীরে ধীরে ক্লান্তির দিকে গড়াচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গের সকার সিটি স্টেডিয়ামের রাত তখন নিশ্ছিদ্র উত্তেজনায় কাঁপছে। 

এই উত্তেজনা ও চাপের ভেতরেও ইনিয়েস্তার খেলা ছিল যেন একটু আলাদা। তিনি দৌড়াচ্ছিলেন, পাস দিচ্ছিলেন, জায়গা খুঁজছিলেন, কিন্তু তার চোখে ছিল অন্য এক একাগ্রতা, যেন তিনি কেবল ম্যাচ খেলছেন না, তিনি কিছু খুঁজছেন।

হয়তো একটি মুহূর্ত।

হয়তো একটি উত্তর।

বিশ্বকাপ বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চ, যেখানে প্রতিটি স্পর্শ ইতিহাস হয়ে যেতে পারে। সেই ইতিহাসের ভেতরেই ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছিল এক ব্যক্তিগত গল্প, যা কেউ দেখতে পাচ্ছিল না।

ঘড়ির কাঁটা ১১৬ মিনিট ছুঁইছুঁই। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে অতিরিক্ত সময়েরও শেষ লগ্ন। 

দুই দলের খেলোয়াড়দের পেশি তখন বিদ্রোহ করছে, ফুসফুস জানান দিচ্ছে চূড়ান্ত ক্লান্তির। স্পেনের ফুটবল ইতিহাসে তখনো পর্যন্ত কোনো বিশ্বকাপের ছোঁয়া লাগেনি, কেবলই বঞ্চনা আর আক্ষেপের দীর্ঘশ্বাস। আর মাত্র কয়েক মিনিট, তারপরেই সেই নিষ্ঠুর টাইব্রেকারের লটারি। কিন্তু ভাগ্যদেবতা সেদিন অন্য কিছুই লিখে রেখেছিলেন।

মাঝমাঠ থেকে শুরু হলো এক ধ্রুপদী ঐকতান। সেস ফ্যাব্রিগাসের পা ঘুরে বলটা যখন ডি-বক্সের ডান প্রান্তে আছড়ে পড়ার অপেক্ষায়, সময় যেন আক্ষরিক অর্থেই থমকে দাঁড়াল। মাধ্যাকর্ষণ শক্তি উপেক্ষা করে শূন্যে ভাসতে থাকা সেই গোলকটির দিকে চেয়ে আছে কোটি কোটি চোখ। আর ঠিক সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিলেন স্পেনের সেই জাদুকর ইনিয়েস্তা। মাপা স্নায়ু, স্থির দৃষ্টি। বলটা মাটিতে চুমু খাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তেই তার ডান পা গর্জে উঠল।

একটি স্পর্শ।

একটি শট।

প্রচণ্ড ভলিতে ডাচ গোলরক্ষক মার্টিন স্টেকেলেনবার্গের সমস্ত প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দিয়ে বল আছড়ে পড়ল জালে। সকার সিটির গগনবিদারী গর্জনে যেন ফাটল ধরল আফ্রিকার আকাশে। স্পেন মেতে উঠল এক বুনো, আদিম উল্লাসে।

 

কিন্তু মহাকাব্যের আসল শ্লোকটি তখনো বাকি। 

গোলের পর পাগলের মতো ছুটতে শুরু করলেন ইনিয়েস্তা। ছুটতে ছুটতেই এক হ্যাঁচকা টানে শরীর থেকে খুলে ফেললেন স্পেনের গর্বের নীল জার্সিটি। ফুটবলের নিয়মে এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ, হলুদ কার্ড অবধারিত। কিন্তু পৃথিবীর কোনো পার্থিব নিয়মকানুন কি সেদিন তাকে ছুঁতে পেরেছিল? 

জার্সি খোলার পর তার ভেতরের সাদা গেঞ্জিতে ফুটে উঠল নীল কালিতে হাতে লেখা একটি অমর পঙ্‌ক্তি, ‘দানি হার্কে, সিয়েম্প্রে কন নোসত্রোস’ (দানি হার্কে, তুমি সবসময় আমাদের সঙ্গেই আছো)।

দানি হার্কে ছিলেন ইনিয়েস্তার বয়সভিত্তিক দলের সতীর্থ, আত্মার পরম আত্মীয়। স্প্যানিশ ক্লাব এস্পানিওলের অধিনায়ক হার্কে মাত্র ২৬ বছর বয়সে, এই জাদুকরী রাতের ঠিক এক বছর আগে পৃথিবীকে বিদায় জানান। ইতালিতে প্রাক-মৌসুম সফরে গিয়ে হোটেলের রুমে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যখন তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন, তখনো তার স্ত্রী সন্তানসম্ভবা। এই অকালপ্রয়াণ ইনিয়েস্তাকে ঠেলে দিয়েছিল এক অতলস্পর্শী শূন্যতায়। চরম বিষাদ আর মানসিক অবসাদে তিনি এতটাই ডুবে গিয়েছিলেন যে, রাতের পর রাত ঘুমোতে পারতেন না। পেশাদার ফুটবলই ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন একসময়।

গোলটি তাই কেবল একটি জয়সূচক গোল ছিল না।

সেটি ছিল এক পুনর্মিলন।

মাঠে তখন ২২ জন খেলোয়াড়, হাজারো দর্শক, কোটি কোটি চোখ। কিন্তু সেই মুহূর্তে ইনিয়েস্তা আর হার্কে যেন একা। একে অপরের সঙ্গে, সময়ের বাইরে দাঁড়িয়ে।

সতীর্থরা তাকে জড়িয়ে ধরে, আনন্দে ভেসে যায় চারপাশ। কিন্তু সেই উল্লাসের ভেতরেও একটি নীরবতা থেকে যায়, যেখানে কেবল অনুভূতিই কথা বলে।

সেদিন, ট্রফি উঠেছিল আকাশে। স্পেন ইতিহাস গড়েছিল।

কিন্তু সেই ইতিহাসের ভেতরে, আরও নিঃশব্দে, আরও গভীরে লেখা হয়েছিল আরেকটি গল্প।

কারণ, কিছু বন্ধুত্ব এমনই হয়। 

যেখানে অনুপস্থিতিও এক ধরনের উপস্থিতি।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments