Sunday, May 3, 2026
Homeআন্তর্জাতিকইরানের জন্য ৬ স্থলপথ খুলে দিয়ে যে বার্তা দিচ্ছে পাকিস্তান

ইরানের জন্য ৬ স্থলপথ খুলে দিয়ে যে বার্তা দিচ্ছে পাকিস্তান

হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে করাচি বন্দরে হাজার হাজার কনটেইনার আটকে পড়ার প্রেক্ষাপটে ইরানে পণ্য পরিবহনের জন্য ছয়টি স্থল ট্রানজিট রুট চালু করেছে পাকিস্তান।

এর মাধ্যমে পাকিস্তানের ভূখণ্ড ব্যবহার করে একটি আনুষ্ঠানিক সড়ক করিডর গড়ে উঠল বলে জানিয়েছে আল জাজিরা।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গত ২৫ এপ্রিল ‘ট্রানজিট অব গুডস থ্রু টেরিটরি অব পাকিস্তান অর্ডার ২০২৬’ জারি করে, যা সঙ্গে সঙ্গেই কার্যকর হয়। এই আদেশ অনুযায়ী, তৃতীয় দেশের পণ্য পাকিস্তানের ভেতর দিয়ে সড়কপথে ইরানে পাঠানো যাবে।

এই ঘোষণার সময়ই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ইসলামাবাদ সফরে যান এবং প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে বৈঠক করেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান দুই মাসের যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পাকিস্তান যে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে, এটি তারই অংশ।

পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রী জাম কামাল খান এই উদ্যোগকে আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং পাকিস্তানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট করিডর হিসেবে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ‘গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ’ বলে উল্লেখ করেছেন।

তবে এ বিষয়ে ইরান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।

ওয়াশিংটন-ইসলামাবাদ সম্পর্কে টানাপোড়েনের আশঙ্কা

এ পদক্ষেপকে যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ইরানের অর্থনীতির জন্য এক বড় ধরনের স্বস্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে চাপে রাখার যে চেষ্টা করছে, পাকিস্তানের এই পদক্ষেপ কি সেই চেষ্টাকে দুর্বল করে দেবে—উঠেছে সেই প্রশ্ন। 
এ ছাড়া, যুদ্ধ বন্ধে ইসলামাবাদের মধ্যস্থতায় চলমান আলোচনাতেই বা এর কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়েও শুরু হয়েছে বিশ্লেষণ।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে আঞ্চলিক অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের এ সিদ্ধান্ত দুই দেশের বাণিজ্য সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হিসেবে পরিচিত পাকিস্তান তেহরানকে এই সুবিধা দেওয়ায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইসলামাবাদের সম্পর্কে নতুন কোনো টানাপোড়েন তৈরি হয় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

ভারতীয় পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল

পাকিস্তানের নতুন এই ট্রানজিট সুবিধা ভারতীয় পণ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

২০২৫ সালের মে মাসে ভারত–পাকিস্তান বিমানযুদ্ধের পর জারি করা একটি আদেশ অনুযায়ী, ভারতের কোনো পণ্য পাকিস্তানের ভেতর দিয়ে পরিবহন নিষিদ্ধ এবং সেই সিদ্ধান্ত এখনো বহাল আছে।

রুট ও পরিবহন সুবিধা

নির্ধারিত ছয়টি রুট পাকিস্তানের প্রধান বন্দর করাচি, পোর্ট কাসিম ও গোয়াদারকে ইরানের দুটি সীমান্ত ক্রসিং গাবদ ও তাফতানের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এই রুটগুলো বেলুচিস্তানের তুরবাত, পানজগুর, খুজদার, কোয়েটা ও দালবন্দিন হয়ে গেছে।

সবচেয়ে ছোট রুট গোয়াদার–গাবদ করিডর, যা ভ্রমণ সময় কমিয়ে মাত্র ২ থেকে ৩ ঘণ্টায় নামিয়ে আনতে পারে। তুলনায় করাচি থেকে ইরান সীমান্তে পৌঁছাতে সময় লাগে ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই রুট ব্যবহার করলে পরিবহন খরচ ৪৫ থেকে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।

বর্তমানে ইরানে পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে সব স্থলপথই কার্যকর বিকল্প হয়ে উঠেছে, কারণ দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত প্রধান সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর অবরোধে কার্যত বন্ধ রয়েছে।

সংঘাতের প্রভাব ও করিডরের জন্ম

বর্তমান যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধ শুরু হয় ২৮ ফেব্রুয়ারি, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়।

এর পরবর্তী সময়ে ইরান হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করে। শান্তিকালে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এটি বৈশ্বিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধমনী। এই পথ অচল হয়ে পড়ায় বিশ্ব বাণিজ্যে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়।

পাকিস্তান ৮ এপ্রিল একটি যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করে এবং ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সরাসরি আলোচনার প্রথম দফা আয়োজন করে। যদিও ওই আলোচনা চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়, দুই দিন পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ আরোপ করে, যা তেহরানের সামুদ্রিক বাণিজ্য কার্যত বন্ধ করে দেয়।

পরবর্তী আলোচনাও স্থবির হয়ে পড়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের ইসলামাবাদ সফর বাতিল করেন। ইরানও জানিয়েছে, অবরোধ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত তারা সরাসরি আলোচনা করবে না, যদিও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আলোচনায় যুক্ত থাকবে।

এই প্রেক্ষাপটে নতুন ট্রানজিট করিডরকে একটি সরাসরি অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা হচ্ছে।

করাচি বন্দরে অচলাবস্থা

বর্তমানে ৩ হাজারের বেশি কনটেইনার করাচি বন্দরে আটকে আছে, কারণ জাহাজগুলো সেগুলো নিতে পারছে না।

একইসঙ্গে যুদ্ধঝুঁকি বীমার খরচ বেড়ে গেছে—সংঘাতের আগে যেখানে এটি ছিল জাহাজের মূল্যের প্রায় শূন্য দশমিক ১২ শতাংশ, এখন তা বেড়ে প্রায় ৫ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে অনেক অপারেটরের জন্য এই অঞ্চলে জাহাজ পাঠানো অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।

আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন

এই করিডর শুধু বাণিজ্য নয়, বরং আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতেও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক অবনতি হওয়ায় এই নতুন পথের গুরুত্ব বেড়েছে।

২০২৫ সালের অক্টোবর এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি–মার্চে দুই দেশের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে এবং সীমান্ত উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।

টর্কহাম ও চামান সীমান্ত এখন আর নির্ভরযোগ্য বাণিজ্য পথ নয়, ফলে মধ্য এশিয়ার সঙ্গে পাকিস্তানের স্থল যোগাযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে।

বিশ্লেষক ইফতিখার ফিরদৌস বলেন, এটি একটি ‘মৌলিক পরিবর্তন’, যার ফলে পাকিস্তান এখন আফগানিস্তানকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি পশ্চিমমুখী বাণিজ্য পরিচালনা করতে পারবে।

তিনি আরও বলেন, এই করিডর পাকিস্তানের ওপর দীর্ঘ সমুদ্রপথের নির্ভরতা কমাবে এবং চীন-সমর্থিত বাণিজ্য রুটের জন্য পাকিস্তানকে প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

সুযোগ ও ঝুঁকি

তবে বিশ্লেষক মিনহাস মাজিদ মারওয়াত সতর্ক করেছেন, আফগানিস্তানকে কোণঠাসা করলে তা অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে, যার প্রভাব পুরো অঞ্চলে পড়বে।

তিনি বলেন, এই উদ্যোগ যেমন বড় সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি নিরাপত্তা ঝুঁকিও রয়ে গেছে—বিশেষ করে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে।

সব মিলিয়ে পাকিস্তানের নতুন স্থল করিডর শুধু একটি বাণিজ্যিক পদক্ষেপ নয়; এটি বৈশ্বিক ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবরোধের প্রেক্ষাপটে বিকল্প বাণিজ্য পথ তৈরি হওয়া দেখাচ্ছে—আজকের বিশ্বে সামরিক শক্তির পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত কৌশলও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এই করিডর সফল হলে দক্ষিণ ও পশ্চিম এশিয়ার বাণিজ্য মানচিত্র বদলে যেতে পারে—আর তা বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যেও নতুন প্রভাব ফেলতে পারে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments