ফ্লোরিডার টাম্পা বে এলাকার যেখান থেকে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল লিমনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল, ওই এলাকা থেকেই নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির মরদেহও উদ্ধার করেছে ফ্লোরিডা পুলিশ।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার শিক্ষার্থী ছিলেন লিমন ও বৃষ্টি। গত ১৬ এপ্রিল থেকে দুজনই নিখোঁজ ছিলেন। এরপর থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের খোঁজে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায়।
তল্লাশির একপর্যায়ে টাম্পা বে এলাকার হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের নিচ থেকে প্রথম লিমনের মরদেহ উদ্ধার করা হয় বলে গত ২৪ এপ্রিল জানায় পুলিশ।
২৬ এপ্রিল হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের কাছাকাছি একটি জলাশয় থেকে মরদেহের আরও কিছু অংশ উদ্ধার করা হয়। পরে গতকাল পুলিশ জানায়, ওই দেহাবশেষ বৃষ্টির।
ফ্লোরিডা পুলিশ কীভাবে বৃষ্টির মরদেহ শনাক্ত করল, এক প্রতিবেদনে তা তুলে ধরেছে মার্কিন গণমাধ্যম এনবিসি নিউজ।
লিমন ও বৃষ্টিকে হত্যার দায়ে ইতোমধ্যে লিমনের সাবেক রুমমেট মার্কিন নাগরিক হিশাম আবুগারবিয়েহকে (২৬) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পাশাপাশি পুলিশও জোর তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফ অফিস গতকাল শুক্রবার জানায়, ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার নিখোঁজ পিএইচডি শিক্ষার্থীর সন্ধান করতে গিয়ে গত ২৬ এপ্রিল উদ্ধার করা মানুষের দেহাবশেষগুলো নাহিদা বৃষ্টির বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
শেরিফ চ্যাড ক্রনিস্টার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ডিএনএ পরীক্ষা, দাঁতের তথ্য ও ভিডিওতে দেখা যাওয়া পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে এটি নিশ্চিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বৃষ্টির মরদেহ বেশ আকস্মিকভাবেই উদ্ধার হয়।
হাওয়ার্ড ব্রিজের কাছে সেন্ট পিটার্সবার্গের ম্যানগ্রোভ বনে গত ২৬ এপ্রিল ছোট নৌকায় করে মাছ ধরছিলেন দুই ব্যক্তি।
মাছ ধরার সময় তাদের একজন হঠাৎ খেয়াল করেন, তার বড়শির সুতা পানির নিচে কোনো ব্যাগে আটকে যাচ্ছে। সুতাটি ছাড়ানোর জন্য তিনি ম্যানগ্রোভের আরও ভেতরের দিকে যান।
বনের গভীরে গিয়ে তারা তীব্র দুর্গন্ধ পান। দুর্গন্ধের কারণ খুঁজতে খুঁজতে একপর্যায়ে তারা পানিতে একটি প্লাস্টিকের ব্যাগ দেখেন। ব্যাগটি কিছুটা ছেঁড়া বা খোলা অবস্থায় ছিল এবং ভেতরে লবণাক্ত পানি ঢুকে গিয়েছিল।
ওই দুজন ব্যাগের ভেতরটা দেখে বুঝতে পারেন, এতে মানুষের দেহের কোনো অংশ আছে। তারা সময় নষ্ট না করে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা সংস্থাকে খবর দেন বলে এনবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
পরে পুলিশ ও ডুবুরিদল এসে সেখান থেকে দেহাবশেষগুলো উদ্ধার করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বৃষ্টির মরদেহ শনাক্তের প্রক্রিয়াটি ছিল বেশ জটিল। এক্ষেত্রে প্রযুক্তির পাশাপাশি পারিপার্শ্বিক প্রমাণের সাহায্য নেওয়া হয়েছে।
মরদেহ শনাক্তের ক্ষেত্রে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় হিসেবে ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়েছে। উদ্ধার দেহাংশ থেকে সংগ্রহ করা ডিএনএ পরীক্ষা করে কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত হয় যে সেগুলো নিখোঁজ বৃষ্টির।
পাশাপাশি ফরেনসিক তদন্তে বৃষ্টির দাঁতের গঠন ও চিকিৎসার আগের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফ চ্যাড ক্রনিস্টার বলেন, ‘আগে বৃষ্টির দাঁতের চিকিৎসা করানো হয়েছিল। সেই তথ্য থেকে পাওয়া দাঁতের গঠনের চিত্রের সঙ্গে উদ্ধার মরদেহের দাঁতের গঠনের হুবহু মিল পাওয়া গেছে।’
এছাড়া, নিখোঁজ হওয়ার দিন ভিডিও ফুটেজে বৃষ্টিকে যে পোশাকে দেখা যায়, উদ্ধার মরদেহের সঙ্গে পাওয়া পোশাক তার সঙ্গে মিলে গেছে। এটি শনাক্তকরণ প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, অভিযুক্ত আবুগারবিয়েহর অ্যাপার্টমেন্টের রান্নাঘরের একটি ম্যাট থেকে রক্তের নমুনা সংগ্রহ করেছিল পুলিশ। ওই রক্ত ও কোষের ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফলও উদ্ধার মরদেহের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় তদন্তকারীরা নিশ্চিত হন যে এটিই নিখোঁজ বৃষ্টির দেহাবশেষ।
ফ্লোরিডা পুলিশ ডিপার্টমেন্ট ইতোমধ্যে বাংলাদেশে বৃষ্টির ভাইকে ফোন করে মরদেহ উদ্ধারের তথ্য নিশ্চিত করেছে।
গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় সাউথ ফ্লোরিডা ইউনিভার্সিটিতে বৃষ্টি ও লিমনের স্মরণে একটি শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট মোয়েজ লিমায়েম বলেন, ‘এই বেদনা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। নাহিদা বৃষ্টি ও জামিল লিমন তাদের জীবন গড়ছিলেন, কমিউনিটি তৈরি করছিলেন এবং আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে অবদান রাখছিলেন।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতিফলকে এই দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর নামও থাকবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। প্রতিবছর সেখানে তাদের স্মরণ করা হবে।

